সময়ের ভারী ফোন, অসময়ের হালকা মন

আজ সকালেই বিছানার পাশে অজান্তে কেঁপে ওঠা বন্ধুটিকে লক্ষ্য করেছেন? আরে, না না।অন্যভাবে নেবেন না। আপনার বন্ধু স্মার্টফোনটির কথা বলছি।

এখন তো নিশ্চয়ই ঠোঁট উল্টে বলবেন, এতে আবার লক্ষ্য করার কি আছে? একটু হলেও আছে। আপনার স্মার্টফোনটির ওজন কত?

কেউ বলবেন কেজি খানেক, আবার কেউ জিজ্ঞেস করতে পারেন, কেন রে ভাই? মোবাইলের ওজন কমানোর ডায়েট প্ল্যান নিয়ে এলেন নাকি?

ব্যাপারটা উল্টো। স্মার্টফোনের জন্মই হয়েছে আপনার মনের ওজন কিংবা বিজ্ঞানের সঠিক ভাষায় বললে মনের ভর কমানোর জন্য। জীবনকে সহজ করার জন্য।

এবার আসি সে হিসেবেই। আপনার মনকে হালকা বা জীবনকে সহজ করতে স্মার্টফোন নিজে কতটা ভর বহন করছে? মনে রাখবেন, হিসেবটা কিন্তু মনে মনে। সত্যিকারের ভর মোবাইলে দিয়ে দিলে আপনার পকেটে কিংবা ভ্যানিটি ব্যাগ তো দূরে থাক,কন্টেইনার ট্রাক লাগতে পারে স্মার্টফোন বইতে।

আমার সবটাতেই বেশি বেশি,তাই না? এবার তাহলে নিজের স্টেটমেন্ট খণ্ডাই। চলুন বিশাল একটা ব্যাগ নেই। এবার একে একে সবকিছু বের করে ভরি যা আপনার স্মার্ট ফোন গিলে খেয়েছে।

বেশিদিন আগের ব্যাপার না। বছর ১৫ আগে ফিরে শুরুতেই একটা ল্যান্ডফোন ভরে নিন ব্যাগে। সাথে টেলিফোন টেবিলের পাশে রাখা পেটমোটা ফোনবুকটা নিতে ভুলবেন না যেন!

একটা ডায়েরি আর কলমও লাগবে নতুন নম্বর কিংবা জরুরি কথা নোট করার জন্য। এই টেবিলের পাশেই, বিছানার মাথার কাছে রাখা টর্চলাইট আর অ্যালার্ম ঘড়িটাকে ব্যাগে ভরেছেন তো?

আরে দাঁড়ান না একটু। ব্যাগের মুখটা বন্ধ করার সময় আসতে বহু দেরি।
বাসায় থাকা ভিসিপি, ভিসিআর, ফিতা ক্যাসেট প্লেয়ার, সিডি প্লেয়ার, এমপিথ্রি প্লেয়ার, ডিভিডি প্লেয়ার কিংবা বিলাসী হলে কলের গানের যন্ত্রটাও ঢুকবে এ ব্যাগে। এবার আদ্দিকালের কিংবা ডিজিটাল ক্যামেরাটা ভরতে পারেন এতে।

হাঁপিয়ে উঠছি। তবুও থামছি না। দেয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডার, টেবিলে রাখা ক্যালকুলেটর কিংবা হাতঘড়িটাও ঢুকতে পারে ব্যাগে।

দেখুন তো কাণ্ডটা, কোত্থেকে যেন বাসার ক্ষুদে সদস্যটা মাটির ব্যাংকটা নিয়ে এসেছে। ফেলেই দিতাম।রাখলাম বিকাশ,রকেটের কথা মনে পড়তেই। টাকা তো ওখানেও জমছে আজকাল।
আপনার বইয়ের তাক পুরোটা ভরে নিলাম ব্যাগে। সিনেমার ডিভিডিগুলোও সব।
টিভিটা পড়ে রইলো? ভরে নিলাম ব্যাগে। এখন মোবাইলেই তো….আস্ত একটা লাইব্রেরি কিংবা রেস্টুরেন্টও ভরতে পারেন ব্যাগ এ। পড়া শেখাচ্ছে গুগল আর ডেটিংটা অনলাইনেই সেরে দিচ্ছে টিন্ডারের মতো অ্যাপ।

তকিছু ভরলেন একটা ডাকপিয়ন আর চিঠি ফেলার বাক্সটাকে বাদ দিলেন কেন! ইমেইল আর ম্যাসেঞ্জার স্মার্টফোনেই ঢুকিয়ে ফেলেছে ওসব। এবার নিজের দেশেই তাকাই। সরকারী-বেসরকারি অফিসের ফাইলের কাজও তো হচ্ছে স্মার্টফোনে।সরকারী সেবার লাখ-লাখ আবেদনও পড়ছে হাতের মুঠোয় থাকা ফোনটাতে।

এবার থামবো? থামলাম। বাকি সব আপনার জন্যই তোলা রইলো। এখন পর্যন্ত আপনার ফোনের ওজন কত হলো? সেঞ্চুরি ছাড়িয়েছে, ঠিক?

ছোট্ট স্মার্টফোনটা এত এত ওজন গিলে খেল, তাতে আপনার মনটা হালকা হয়েছে তো?

এককথায় জবাব দিতে কষ্টই হয়ে যাবে। কারণ, না এর পাল্লাটা ভারি হওয়ার কথা। জীবন সহজ করার কথা বলে স্মার্ট ফোন লুকিয়ে কেড়ে নিয়েছে যত্নে আগলে রাখা জীবনের অনেকটা।

শুরু থেকেই শুরু। ল্যান্ডফোনের জগতটাতে ফোনটা থাকতো এক জায়গাতেই বাধা।অনেকটা গাছের মতো।

স্মার্টফোন ব্যবহার

আর এখন, স্মার্ট ফোন উড়ে বেড়ায় আপনার সাথে, অনেকটা পাখির মতো। আপনার জীবনে তাই গাছের সবুজ নীরবতা বিদায় নিয়ে পাখির কিচির-মিচিরে ভরে গেছে। হালকা হয়নি মন।
গান শোনার স্নিগ্ধতা হারিয়েছে আপডেটের জ্বালায়। রোজ রোজ নতুন গান, কোনটা ছেড়ে কোনটা?

ছবির জগতটা আরো এলোমেলো। যত্ন করে তোলা ছবির জগতটা কেড়ে নিয়েছে সেলফি। নিজস্বতা হারিয়েছে নিজের ছবিতেই। তীর্থের কাক হয়ে অপেক্ষা করছি, কখন মানুষ বলবে, “দারুণ, nice, ok fine”

ভালবাসার মানুষের হাতের স্পর্শের জায়গা নিয়েছে স্পর্শকাতর স্ক্রিনে বুড়ো আঙ্গুলের নাচন।
আপনার কন্ঠকেও দমিয়ে দিয়েছে মুঠোফোন। এখন আপনি আর আড্ডায় কিংবা মিছিলে আওয়াজ তোলেন না, চিৎকার করে রিক্সা, সিএনজি ডাকেন না।

কণ্ঠের জায়গা নিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া, রাইড শেয়ারিং অ্যাপগুলো। বাড়ছে বন্ধুত্ব, মিছে আলোর বন্ধুত্ব। কমছে সম্পর্কের বাঁধন, আলগা হচ্ছে ধীরে ধীরে।

এত ভারী বাতাসে মনটা হালকা হলো কোথায়?